Header Ads

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারী পার্ক, গাজীপুর

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারী পার্কের ইতিহাস


ভাওয়াল গড়ের ছোট ছোট টিলা (চালা) ও নীচু ভূমি (বাইদ) সমৃদ্ধ শালবনে দেখা যেত আমলকি, বহেড়া, হরিতকী, করই, শিমূল, হলদু, পলাশ, চাপালিশ, কুসুম, পিতরাজ, উদাল এবং বিবিধ লতাগুল্মরাজি। এ বনে দেখা যেত মায়া হরিণ, চিতাবাঘ, বন বিড়াল, গন্ধগকুল, শিয়াল, সজারু, অজগর, বানর, হনুমানসহ অসংখ্য প্রজাতির পাখি। শালবনে প্রায় ৬৩ প্রজাতির গাছপালা ও ২২০ প্রজাতির বন্যপ্রাণী দেখা যেত। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নগরায়ন, শিল্পায়ন, বন ধ্বংস করে কৃষি জমির বিস্তার, আবাসন, জবরদখল ও ভূমি বিরোধের কারনে শাল বনের অস্তিত্ব দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। বন্যপ্রাণী প্রাকৃতিক পরিবেশ, খাদ্যচক্র ও জীববৈচিত্র্যের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। মানুষের অস্তিত্বের জন্য বন্যপ্রাণীর ভূমিকা অপরিসীম। জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, ইকোট্যুরিজমের উন্নয়ন, পর্যটন শিল্পের বিকাশ, শিক্ষা, গবেষণা ও চিত্তবিনোদনের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি বিজড়িত ভাওয়ালগড় এলাকায় ‘‘সাফারী পার্ক’’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহন করা হয়।

[caption id="attachment_5547" align="aligncenter" width="768"] বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারী পার্ক, গাজীপুর[/caption]

গাজীপুর জেলার শ্রীপুর উপজেলাধীন মাওনা ইউনিয়নের বড় রাথুরা মৌজা ও সদর উপজেলার পীরুজালী ইউনিয়নের পীরুজালী মৌজার খন্ড খন্ড শাল বনের ৪৯০৯.০ একর বন ভূমি ছোট বড় বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণির জন্য নিরাপদ আবাসস্থল হিসাবে পরিচিত। এর মধ্যে ৩৮১০.০ একর এলাকাকে সাফারী পার্কের মাস্টার প্ল্যানের আওতাভূক্ত করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারী পার্ক শীর্ষক প্রকল্পটি ২০১০ সালে ৬৩.৯৯ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে একনেক কর্তৃক অনুমোদিত হয় এবং পার্ক প্রতিষ্ঠা কার্যক্রম শুরু হয় এবং ২০১১ সালের ২ ফেব্র“য়ারী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারী পার্ক, গাজীপুর এর আনুষ্ঠানিকভাবে নির্মাণ কার্যক্রম শুরু হয়। প্রকল্পের শুরুতে কোন মাষ্টার প্লান প্রণয়ন করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে দেশী-বিদেশী বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় আন্তর্জাতিক মানের সাফারী পার্কে উন্নীত করার লক্ষ্যে একটি মাষ্টার প্লান তৈরী করা হয়। মাষ্টার প্লানে বর্ণিত কার্যক্রম বাস্তবায়ন ও ভূমি অধিগ্রহনের জটিলতা নিরসনের লক্ষ্যে ৪ অক্টোবর ২০১১ তারিখে ’’বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারী পার্ক, গাজীপুর (১ম সংশোধিত) প্রকল্পটি একনেক কর্তৃক বর্ধিত আকারে ২১৯.৮৯ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে অনুমোদিত হয়। পরবর্তীতে অক্টোবর / ২০১৩ মাসে একনেক কর্তৃক ২৬৩.০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ” বঙ্গবন্ধু শেখমুজিব সরকারী পার্ক , গাজীপূর (২য় সংশোধন) প্রকল্প পাশ হয় ।

[caption id="attachment_5545" align="aligncenter" width="768"] বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারী পার্ক, গাজীপুর[/caption]

সাফারী পার্কটি দক্ষিণ এশীয় মডেল বিশেষ করে থাইল্যান্ডের সাফারী ওয়ার্ল্ড এর সাথে সামঞ্জস্য রেখে স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়াও ইন্দোনেশিয়ার বালি সাফারী পার্কের কতিপয় ধারনা সন্নিবেশিত করা হয়েছে। সাফারী পার্কের চারদিকে নির্মাণ করা হচ্ছে স্থায়ী ঘেরাা এবং উহার মধ্যে দেশী/বিদেশী বন্যপ্রাণীর বংশবৃদ্ধি ও অবাধ বিচরণের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে যাতে পর্যটকগণ চলমান যানবাহনে অথবা পায়ে হেঁটে ভ্রমণ করে শিক্ষা, গবেষণা ও চিত্তবিনোদনের সুযোগ লাভ করবেন। সাফারী পার্কের ধারনা চিড়িয়াখানা হতে ভিন্নতর। চিড়িয়াখানায় জীবজন্তুসমূহ আবদ্ধ অবস্থায় থাকে এবং দর্শনার্থীগণ মুক্ত অবস্থায় থেকে জীবজন্তু পরিদর্শন করেন। কিন্তু সাফারী পার্কে বন্যপ্রাণীসমূহ উন্মুক্ত অবস্থায় বনজঙ্গলে বিচরণ করবে এবং মানুষ সতর্কতার সহিত চলমান যানবাহনে আবদ্ধ অবস্থায় জীবজন্তুসমূহ পরিদর্শন করবেন।

অবস্থান ও আয়তনঃ
ঢাকা থেকে ৪০ কিলোমিটার উত্তরে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বাঘের বাজার থেকে ৩ কিলোমিটার পশ্চিমে সাফারী পার্কটির অবস্থান। সাফারী পার্কের আয়তন ৩৮১০.০ একর। এর মধ্যে ৫৫০ একর ব্যক্তি মালিকানাধী ভুমি রয়েছে যা অধিগ্রহণ প্রক্রিয়াধীন আছে। বর্তমানে ৩৪০০.০ একর এলাকায় প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। অবশিষ্ট এলাকা পর্যায় ক্রমিকভাবে উন্নয়ন কার্যক্রমের আওতায় আনা হবে।

ঐতিহাসিক পটভূমিঃ
গাজীপুরের শাল বন ঐতিহাসিকভাবে ভাওয়াল রাজার জমিদারী অংশ হিসেবে খ্যাত ছিল। ১৯৫০ সলের জমিদারী উচ্ছেদ ও প্রজসত্ব আইন জারীর পর শালবনের ব্যবস্থাপনা বন বিভাগের নিকট হস্তান্তর করা হয়। তবে অধিকাংশ চালা জমির শালবন সমৃদ্ধ বনভূমি বিধায় বন বিভাগের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও বাইদ জমি ব্যক্তিমালিকানাধীন। শালবন ঢাকার অতি নিকটে হওয়ায় দ্রুত শিল্পায়ন, জবর দখল, গো-চারণ ও ভূমিদস্যুতার কারণে শালবনের জীববৈচিত্র্য দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। শিল্পকারখানা হতে নিঃসরিত বর্জের কারণে জীববৈচিত্র্য মারাত্বকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে।

সাফারী পার্কের মূল উদ্দেশ্যঃ
(১) শাল বনের বন্যপ্রাণী ও উদ্ভিদ বৈচিত্র্য সংরক্ষণ ।
(২) বাংলাদেশের বিরল ও বিলুপ্ত প্রায় বন্যপ্রাণীকে নিজ আবাসস্থলে (in-situ) এবং আবাসস্থলে বাহিরে (ex-situ) অবস্থায় সংরক্ষণ ও উন্নয়ন সাধন ।
(৩) ঢাকা মহানগরীর অতি নিকটে ইকো-ট্যুরিজমের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে পর্যটন শিল্পের বিকাশ, দারিদ্র্য বিমোচন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা ।
(৪) চিত্তবিনোদন, শিক্ষা ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি করা ।
(৫) বন্যপ্রাণীর খাদ্য উপযোগী ফলজ, ফডার, ও মিশ্র প্রজাতির বাগান সৃজন ।
(৬) শালবনের বন্যপ্রাণী যেমন বানর, মায়া হরিণ, বেজী, বনরুই, বাঘদাস, বন বিড়াল, খড়গোশ, শিয়াল, খেকশিয়াল ও অজগরসহ বিপন্ন বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল সৃষ্টি ও সংরক্ষণ করা ।
(৭) বিরল ও বিপন্ন স্তন্যপায়ী প্রাণী যেমন বাঘ, চিতাবাঘ, সাম্বার হরিণ, মায়া হরিণ, চিত্রা হরিণ, প্যারা হরিণ এবং অন্যান্য তৃণভোজী বন্যপ্রাণীর প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণ ও বংশবৃদ্ধির সুযোগ সৃষ্টি করা ।
(৮) গণ্ডার, এশীয় হাতী, পরিযায়ী পাখী, জলজ পাখী, বনছাগল, সিংহ, শ্লথ বীয়ার, কালো ভাল্লুক, মিঠা পানির কুমির, লোনা পানির কুমির, নীল গাই, জলহস্তী ইত্যাদি বিপন্ন ও বিলুপ্ত বন্যপ্রাণীর প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণকরন ।
(৯) আহত ও উদ্ধারকৃত বন্যপ্রাণীর চিকিৎসার নিমিত্তে বন্যপ্রাণীর সেবাশ্রম ও হাসপাতাল স্থাপন ।
(১০) সারাদেশে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে ব্যাপক গণসচেতনতা সৃষ্টি।

পর্যকটগণ যা উপভোগ করবেনঃ
১/ তথ্য ও শিক্ষা কেন্দ্রে ভিডিও ব্রিফিং/প্রামাণ্য চিত্রের মাধ্যমে সাফারী পার্ক সম্পর্কে সাম্যক ধারণা নিতে পারেন।
২/ ন্যাচারেল হিস্ট্রি মিউজিয়ামে বন্যপ্রাণী ও উদ্ভিদ প্রজাতি বৈচিত্র্য সম্পর্কে ছাত্র-ছাত্রী ও গবেষকগণ পরিচিতি লাভ করতে পারেন।
৩/ প্রটেকটেট মিনিবাসে চড়ে প্রাকৃতিক পরিবেশে বিচারণরত বাঘ, সিংহ, হাতী, সাম্বার, মায়া হরিণ,চিত্রা হরিণ, বানর, হনুমান, ভল্লুক, গয়াল, কুমির ও বিচিত্র পাখী দেখাতে পাবেন।
৪/ লেকের ধারে দেখতে পাবেন অসংখ্য অতিথি ও জলজ পাখী।
৫/ পর্যবেক্ষণ টাওয়ারে উঠে বনাঞ্চলের নয়নাভিরাম সৌন্দর্য ও বন্যপ্রাণী অবলোকন করতে পারবেন।
৬/ পাখীশালায় দেখতে পাবেন দেশী-বিদেশী অসংখ্য পাখী।
৭/ বেস্টনীতে বিরল প্রজাতির প্যারা হরিণ ও
৮/ রাত্রি যাপনের জন্য রাখছে বিশ্রামাগার।

পর্যটকদের জন্য অনুসরণীয়ঃ
১/ পলিথিন ও অপচনশীল পদার্থ যত্র-তত্র না ফেলে ডাস্টবীনে রাখুন।
২/ সিগারেটের প্যাকেট, পরিত্যক্ত কাগজ, নষ্ট ব্যাটারী, লাইটার ও বিস্কুট, চানাচুর প্রভৃতির প্লাস্টিকের মোড়ক যেখানে সেখানে না ফেলে একটি নির্দিষ্ট স্থানে ফেলা।
৩/ বাঘ ও সিংহের বেস্টনীতে চলন্ত গাড়ী হতে না নামা।
৪/ কোমল ও বিশুদ্ধ পানীয় বোতল জঙ্গলে না ফেলা।
৫/ মাইক বাজানো, বাজি বা পটকা ফোটানো, গান-বাজনা ও দলবদ্ধভাবে হৈ-চৈ না করা।
৬/ বিশ্রামাগার ব্যবহার করতে হলে আপনাকে পূর্ব থেকে বুকিং নিতে হবে।
৭/ পূর্বেই টিকেট কাউন্টার হতে টিকেট ক্রয় বাঞ্চনীয়।
৮/ বন্যপ্রাণীকে যেকোন ধরণের খাবার প্রদান থেকে বিরত থাকবেন।
৯/ বাইরের কোন খাবার পার্কের ভিতরে না নেওয়া।

No comments

Theme images by Storman. Powered by Blogger.